সোমবার, ৩০ জুলাই, ২০১৮

দাঁতের ক্ষয়রোগের প্রধান কারণঃ টুথব্রাশ এর বেঠিক ব্যাবহার।

দাঁতের ক্ষয়রোগের প্রধান কারণঃ টুথব্রাশ এর বেঠিক ব্যাবহার।

দাঁত না মাজলে দাঁতের যে অপূরণীয় ক্ষতি হবে তা আর নতুন করে বলার কিছু নয়, কিন্তু এই দাঁত মাজাই হতে পারে দাঁত নষ্ট হওয়ার কারণ, যদি টুথব্রাশের ব্যাবহার সঠিক ভাবে না হয়!
সঠিক টুথব্রাশ বাছাই করা আর সঠিক নিয়মে টুথব্রাশের ব্যাবহার অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের ডেন্টালের সচেতনতা মূলক বিষয় ডেন্টাল পাবলিক হেলথের শিক্ষকদের বলতে শুনেছিলাম "দাঁত না মাজার কারণে যতটা ক্ষতি না হয়, ভুলভালভাবে মাজার কারণে তার চেয়েও বেশী ক্ষতি হয়"।
তাই দাঁতের যত্নে আর দাঁত মাজার ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো খেয়াল রাখা একান্ত প্রয়োজন।

১. সঠিক টুথব্রাশ বাছাই করনঃ
দাঁত মাজার প্রথম, প্রাথমিক ও প্রধান হাতিয়ার হল টুথব্রাশ, আর সঠিক টুথব্রাশ সনাক্তকরণও তাই বাঞ্ছনীয়। বিশেষ করে আজকাল বিভিন্ন কোম্পানি ব্যবসা করার জন্য বাহারি ডিজাইনের ব্রাশ ও বিজ্ঞাপন বাজারে ছেড়েছে, সেখানে কোনটা আপনার উপযোগী হবে সেটা বুঝতে ডেন্টিস্টের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ব্রাসেলস্ বা ব্রাশের রোয়ার কোয়ালিটির ভিত্তিতে টুথব্রাশ প্রধানত হার্ড, মিডিয়াম আর সফট ইত্যাদি প্রকারের হয়ে থাকে। এ বিষয়ক তথ্য ব্রাশের প্যাকেটের গায়েই লিখা থাকে। বয়স-কাল নির্বিশেষে কোনও একটা বাছাই করতে হলে সফট বা নরম ও নমনীয় ব্রাশই সবচেয়ে উপযোগী। টুথব্রাশ যত বেশি নমনীয় হবে দাঁতের ফাঁকেফাঁকে তত সহজে পরিষ্কার করতে পারবে, তাছাড়া ব্রাশ কোমল ও নমনীয় হলে দাঁতের উপর তার শিরিষকাগজ দিয়ে ছিলে ফেলার মত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ততই কম হবে।

২. দাঁত মাজার পদ্ধতিঃ
এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট!
সাধারণত দাঁত মাজার কথা বললে যে জিনিষ আমাদের মনে আসে সেটা হল, ব্রাশ দিয়ে ডাইনে-বায়ে বা সাইড টু সাইড ঘষে দাঁত মাজা। কিন্তু এই পদ্ধতিটি সঠিক নয়। এই পদ্ধতিতে দাঁত মাজলে দাঁতের উপর ব্রাশের অসম প্রেশার পরে বিশেষ করে সারভাইকাল প্রান্ত (মাড়ির প্রান্তে দাঁতের গোড়ার কাছে) সংলগ্ন জায়গাতে বেশি প্রেশার পরে ও সহজে ক্ষয় হওয়া শুরু করে। ডাইনে-বায়ে ব্রাশ চালালে সেটা অনেকটা গাছের গোড়ায় চালানো কড়াতের মত কাজ করে। সাধারণত এখানেই এই কারণেই শিরশিরানি শুরু হয়। এছাড়া এভাবে ব্রাশ করলে ঠিকমত ময়লা বেরহয়ে যাওয়ার সুযোগও কম পায়। দাঁত মাজার সঠিক পদ্ধতি হল দাঁতের গোরা থেকে শুরু করে আগার দিকে।



বুঝার সুবিধার্থে সহজ ভাষায় বললে আগের দিনে নানীমা-দাদীমারা পুরানো টুথব্রাশ দিয়ে পুরানো চিরুনি পরিষ্কার করতেন। চিরুনির দাঁতগুলোর গোড়ায় ব্রাশ লাগিয়ে সেখান থেকে বাইরের দিকে টেনে ধুলা-ময়লা বের করে আনতেন। দাঁত মাজার ভঙ্গিমাও তেমনই হবে, অর্থাৎ ব্রাশের গতির দিক দাঁতের ফাঁকের সমান্তরালে দাঁতের গোঁড়া থেকে বাইরের দিকে হতে হবে।



প্রথমে ব্রাশটিকে তীর্যক ভাবে দাঁতের গোঁড়ার কাছে স্পর্শ করে কোমল ভাবে বাইরের দিকে দাঁতের ফাঁকের সমান্তরালে টেনে নিয়ে যেতে হবে। তবে ব্রাশ করার মদ্ধে মদ্ধে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আর আগেপিছে করেও ব্রাশ করার প্রয়োজন আছে, তবে সেটাও করতে হবে কোমল স্পর্শের মাধ্যমে।



৩. চর্বণ ও পেষণ দাঁতের প্রতি বিশেষ মনযোগ দিনঃ
মানুষের ও অন্যান্য প্রাণীর দাঁত গুলো আকার আর ভূমিকার ভিত্তিতে নামকরণ ও শ্রেণীকরণ করা হয়। কর্তন (incisor/খরগোশ এর মত দাঁত) আর ছেঁদন (canine/কুকুর বা বাঘের মত চোখা দাঁত) সামনের দিকে থাকে তাই এগুলাকে anterior teeth বলে, আর চওড়া আকারযুক্ত চর্বণ ও পেশন দাঁত গুলো পিছনে গালের মদ্ধে আড়ালে থাকে তাই এগুলা কে posterior teeth বলে। হাতির চিবানোর দাঁত যেমন মুখের ভিতরে আড়ালে থাকে, তেমনি মানুষের চর্বণ ও পেষণ দাঁত আড়ালে থেকে বেশিরভাগ কঠিন কাজগুলো করে। আবার গড়ন-আকৃতির কারনে এই দাঁতগুলো ক্ষয় প্রবণ বেশি হয়। এই দাঁতগুলোর বিপরীত দাঁতের সাথে সংযোগ তলে (occlusal surface-এ) ঢিবি/শিঙ এর আকৃতির অংশ cusp গুলোর মাঝে/পাশ দিয়ে দাঁতের গায়ে যেই লম্বা রেখা আকৃতির (অনেকটা নদীর মত) খাঁজ থাকে সেখানে খাবার সময় অত্যন্ত সূক্ষ্ম খাবারের কনা জমা হতে থাকে যা অনেক সময় ডেন্টিস্টের সাহায্য ছাড়া পরিষ্কার করা সম্ভব না। সাধারণত এই রেখা আকৃতির খাঁজ(groove ও বা ফাঁটলের মত অস্বাভাবিক গভীর খাঁজ বা fissure) ও আড়াআড়ি দুই খাজের সংযোগস্থলের ক্ষুদ্র কূপ আকৃতির গর্ত (pit) -এর মধ্যে খাদ্য কনা জমে caries বা জীবাণুঘটিত ক্ষয় রোগ হয়। অতিক্ষুদ্র এমনকি ব্রাশের একেকটি চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম হওয়ায় ব্রাশ করার মাধ্যমে এই খাঁজ আর গর্তের মধ্যে থেকে খাদ্যকণা বের করে আনা সম্ভব হয়না। পরবর্তিতে আণুবীক্ষণিক আকারের জীবাণুরা এখানে বাসা বাধে আর জমে থাকা খাদ্য কনায় গাঁজন প্রক্রিয়ায় পচন ধরায়। জীবাণুরা জমে থাকা খাবার কনাকে বিশেষকরে শর্করা বা চিনি জাতীয় খাবারের কনা গাঁজন প্রক্রিয়ায় নিজেরা খাদ্য ও শক্তি নেয় আর এসিড জাতীয় পদার্থ নিঃসরণ করে আর দাঁত এসিডদগ্ধ হয়। সূক্ষ্মতর ফাঁকে এই এসিড জমে যার কারনে এগুলা নিজে নিজে পরিষ্কার করা যায় না। এসব কারণে এই দাঁতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশী। কিন্তু এই দাঁতগুলো যত্ন পায় সবচেয়ে কম। সাধারণত আমরা সামনের দিকের দাঁত গুলার যত্ন বেশি নেই আর পিছনের দিকের দাঁত গুলোর দিকে খুব একটা মনোযোগ দেই না। কিন্তু প্রতিবার দাঁত মাজার সময় যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে পিছনের দাঁত গুলোকে পরিষ্কার করতে হবে। বিশেষ করে occlusal surface যায়গাটা মনোযোগ দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।
ডেন্টাল চিকিৎসা বিজ্ঞানে পরিষ্কার করে উপযোগী ফিলিং করার পদার্থ(pit and fissure sealant) দিয়ে দাঁতের এই খাঁজ ও গর্ত গুলো পূর্ণ করে মসৃণ করে দেওয়ার চিকিৎসাও আছে, এটা করলে আর ময়লা জমার ভয় থাকেনা।

৪. অতিরিক্ত বল না প্রয়োগ করে দাঁত মাজাঃ
আমাদের সমাজের মানুষের একটা ভুল ধারনা "যে কোনও কার্য যত বেশী বল প্রয়োগের দ্বারা করা যায় ততই উত্তম", যেমন দরজা লাগানো বা কোনও বস্তু ঠেলে উঠানো। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সার্থকতার জন্য বলের চেয়ে technique বা প্রযুক্তিগত কৌশলই বেশী গুরুত্বপূর্ণ। দাঁত মাজার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই। যত জোর লাগিয়ে ঘষেমেজে ব্রাশ করবেন, দাঁত ক্ষয়ের সম্ভাবনা ততই বাড়বে। যথাসম্ভব নরমভাবে, কোমলতা বজায় রেখে, ব্রাশটি দিয়ে কোমল স্পর্শের মাধ্যমে দাঁত মাজতে হবে, আর দাঁতের উপরিতলের যতটা অংশ পরিষ্কার করা যায় ততটাই করতে হবে। একটা সহজ উপায় হচ্ছে ব্রাশ করার সময় বা ব্যবহৃত ব্রাশের ব্রাসেলস্ বাঁকা বা বিকৃত হয়ে যায় কিনা সেটা লক্ষ রাখা। যদি বাঁকা হয় তাহলে বুঝবেন আপনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রেশার দিয়ে দাঁত মাজেন, আর এতে দাঁতের ক্ষয় হবে।
মনে রাখবেন দাঁত দেহের একটা জীবন্ত অংশ, এর সাথে শিরিশকাগজ দিয়ে লোহার জং উঠানোর মত ঘসা মাজা করা ঠিকনয়।

৫. কতক্ষন ধরে দাঁত মাজছেন/মাজবেনঃ
দাঁত মাজার সময় লক্ষ রাখার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল কতক্ষন ধরে দাঁত মাজছেন। সাধারণত দাঁত মাজার আদর্শ সময়সীমা ২-৩মিনিট। আমাদের দেশে মানুষের একটা বদ অভ্যাস আছে সেটা হল দাঁত মাজতে মাজতে প্রভাত ভ্রমণ আর আড্ডা দেওয়া। এতে কতক্ষণ ধরে দাঁত মাজা হচ্ছে সেই সময়ের হিসাব থাকে না। দীর্ঘকাল বৃষ্টির ধারায় দুর্জেয় পাহাড়ও ক্ষয় হয়ে যায়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় লাগিয়ে ব্রাশ করাও দাঁত ক্ষয় এর কারণ।
বিপরীতে এমন মানুষও আছেন যারা ব্যাস্ততার অজুহাতে পুরো ২মিনিট দাঁত মাজেন না, সেটাও ভুল। যথেষ্ট সময় নিয়ে দাঁত না মাজাও দাঁতের উপর ময়লা পরদ পরার কারন আর এই পরদের কারণেও দাঁত ক্ষয় হয়। পরদ গুলার মধ্যে জীবাণু আর এসিড থাকে যা দাঁতের শরীরের মিনারেল ধীরে ধীরে dissolve করে বা গলিয়ে ফেলে। পরদের আরো ক্ষতিকারক দিক আছে। এই পরদ খাওয়ার সাথে খেয়ে ফেললে পেটখারাপ, আমাশয় সহ পরিপাকতন্ত্রে ইনফেকশন/সংক্রমণ হতে পারে।

৬. মুখের ভিতরের রাসায়নিক অবস্থাঃ
রাসায়ন বিদ্যায় pH বলতে একটা বিষয় আছে। কোনও দ্রবন বা পরিবেশ এসিড না ক্ষারক স্বভাবের সেটা বুঝাতে এটা ব্যবহৃত হয়।
নিরপেক্ষ বিশুদ্ধ পানির pH এর মান ৭, এরচেয়ে pH এর মান কম হলে এসিড আর বেশি হলে ক্ষারীয়। pH যত কম তত তীব্র এসিড। মুখের লালার pH পানির চেয়ে কম অর্থাৎ এসিড স্বভাবের। বিশেষ বিশেষ সময় যেমন খাবার পরপর লালার pH আরোও নিচে নেমে যায়, যা দাঁতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মুখের মদ্ধে টক টক ভাব লাগলেও বুঝবেন pH লেভেল নেমে গেছে, কারণ টক মানেই এসিড। এসিড বা অতিরিক্ত কম pH দাঁতের বড় শত্রুগুলোর মধ্যে অন্যতম। মুখের pH অতিরিক্ত নেমে গেলে সে অবস্থায় দাঁত মাজলেও দাঁতের ক্ষয় হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে দাঁত মাজার আগে ও খাবার পরে ভালভাবে কুলি করে ফেললে মুখের ভিতরের অতিরিক্ত এসিডিয় মাত্রা কমবে। বিশেষকরে টক, মিষ্টি ও চটচটে খাবার গ্রহণের পরে ভালোভাবে কুলি করে ফেলা ভাল। অর্থাৎ এক কথায় এক্ষেত্রেও তাড়াহুড়া করে দাঁত ঘষামাজা সুরু করা ঠিক নয়।

৭. প্রতি ছয়মাস বা প্রয়োজনানুসারে স্কেলিং করানোঃ
স্কেলিং scaling হচ্ছে দাঁতে জমা পাথর পরিষ্কার। দাঁতের গায়ে জমে যাওয়া ময়লায় লালা ও খাবারে উপস্থিত খনিজ কনা মিশে আস্তে আস্তে শক্ত হয়, যা ব্রাশ বা সুধু বাহ্যিক ওষুধ প্রয়োগে অপসরণ সম্ভব নয়। সাধারণত কখন স্কেলিং করতে হবে সেটা কিছুটা নিজেরও বুঝে নিতে হবে, যেমন দাঁতে পাথরের মত ময়লা জমেছে কিনা লক্ষ রাখতে হবে। দাঁত আঁকাবাঁকা হলে ময়লা ও পাথর বেশি জমে।
স্কেলিং বিষয়ে কয়েকটি ভুল ধারনা আছে, যেমন একবার করলেই ছয়মাস পরপর করতে হবে, তাই এর চেয়ে না করাই ভাল। এটা ঠিক নয়, প্রথমত যেকোনও বয়সের মানুষের জন্য ছয়মাস পরপর এমনিতেই স্কেলিং করার নিয়ম আছে। দ্বিতীয়ত নিয়মিত স্কেলিং করা নিয়মিত দিনে দুইবার দাঁত মাজা বা প্রতিবার টয়লেট করার পর ফ্লাশ করার মতই ব্যাপার, নিয়মিত না করলে নোংরা জমতেই থাকবে।
আরেকটা ভুল ধারনা স্কেলিং করলে দাঁত দুর্বল হয়ে যায়। যাদের দাঁতে অত্যাধিক পাথর জমে যায় তাদের স্কেলিং করার পর পরই সাধারণত দাঁতে খোঁচা খোঁচা বা হালকা শিরশিরানি ভাব লাগে। অনেকের প্রচুর রক্ত ক্ষরণ হয়। এটার কারণ দীর্ঘকাল স্কেলিং না করায় দাঁতের গোড়ায় গভীর পর্যন্ত পাথর চলে যায়, তখন গভীর থেকে পাথর তুলে আনতে ডাক্তার আর রোগীর দুজনারই কষ্ট বেশী হয়। আবার স্কেলিং এর সময় দাঁতের গোড়ার গভীর থেকে থেকে শক্ত পাথর খুলে আনার সময় সেখানে আঘাত লাগে, তাই রক্ত ক্ষরণ হয় আর খোঁচা-খোঁচা/শিরশিরানি  লাগে।(অর্থাৎ স্কেলিং করার কারণে নয় বরং দীর্ঘকাল স্কেলিং না করাই এ সব অসুবিধার কারণ)। এর থেকেই সে সব ভূল ধারণা জন্মায়। না, স্কেলিং করার সময় এমন কিছুই করা হয় না যাতে দাঁত  দুর্বল হয়ে যাবে। বরং দীর্ঘদিন পাথর জমা থাকলে বা স্কেলিং না করলেই দাঁত দুর্বল হয়ে যায়, নিয়মিত স্কেলিং করলে এ ধরণের ঝামেলা কখনওই আসবে না।

৮. ভিটামিন ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার এবং ফলমূল ও শাক সবজি খাওয়াঃ
সংক্রমণ রোধে, আর স্বাস্থ্যের ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধে বিভিন্ন ভিটামিন কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ভিটামিন সমৃদ্ধ শাকসবজি আর ফলমূল স্বাস্থ্য ও দাঁতের রক্ষার্থে জন্য বিশেষ উপযোগী। পেয়ারা, আপেল, নাসপতি, শসা বা কুল-বড়ই এর মত ফল আর শাখ আলু, মিষ্টি আলু, গাজর বা মুলা'র মত কাঁচা খাওয়া যায় এমন ফলমূলাদি চিবিয়ে খেলেও দাঁত পরিষ্কার থাকে। দিনে এমন ফলমূলাদি অন্তত একবার খেলে প্রতিদিনকার দাঁতের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা সহ অনেক দিক থেকে দাঁতের উপকার হবে।

পরিশেষে বলা যায় জীবন্ত দেহের একটা জীবন্ত ও ভীতর থেকে সংবেদশীল অংশ হচ্ছে দাঁত। এর পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার সময়ও যত্নশীল হতে হবে যাতে হিতে বিপরীত হয়ে না যায়।
দাঁত ব্রাশ করার কৌশল সম্পর্কে ইনটারনেটেও প্রচুর উপযোগী তথ্য পাওয়া যায়, প্রয়োজনে এই বিষয়ে ইনটারনেটে সন্ধান করে অধ্যায়নও করতে পারেন।

রমজান মাসের টুথপেস্ট ও টুথব্রাশের ব্যাবহার

 রমজান মাসে রোজাদার মুসলিমদের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে রোজা রেখে টুথপেস্ট ব্যবহার করা যাবে কি না? সাধারণত আলেমগন বলেন রোজামুখে পেস্ট ব্যবহার করলে রোজা মাখরু হয়ে যাবে কারণ পেস্টের একটা বিশেষ স্বাদ থাকে। আবার অনেকেই একটা ভুল ধারনা পোশন করেন যে পেস্ট-ব্রাশ এর থেকেও মেসওয়াক লাঠিই দাঁত ও মাড়ির জন্য বেশি স্বাস্থ্যসম্মত। প্রথমত রোজা মুখে পেস্ট ব্যবহার করতে হবে না। যদি একটা সময় তালিকা করে নিতে পারেন।

মাগরিবের আজান বা ইফতারের শুরুর সময় থেকে শুরু করে পরের দিন ফজরের আজান বা সেহরীর শেষ সময়সীমা পর্যন্ত সময় আছে আপনার হাতে। যদি অন্যান্য দিনের দাঁত মাজার সময়তালিকার সাথে তুলনা করি তাহলে সকালের দাঁত মাজার পরিবর্তে ইফতারের আগে/পরে দাঁত ব্রাশ করা যেতে পারে, আগে করতে পারলে বেশী ভাল হয়। আবার রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তো দাঁত মাজার কোনও বাঁধাই নেই। সেহরীর শেষে তৃতীয়বার দাঁত মাজাটাও জরুরি, এতে দিনে তিনবার দাঁত মাজার আদর্শ নিয়ম তালিকাও পূর্ণ করতে পারবেন, এতে রোজারাখা অবস্থায় পরদিনও মুখ অনেকটাই ফ্রেশ থাকবে।

অনেকের আবার খাবার সাথে সাথে দাঁত মাজতে গেলে বমিবমি ভাব লাগে, আমারও এক সময় হত, সেক্ষেত্রে সেহরী খাওয়া যদি ৫-১০ মিনিট থাকতে শেষ করতে পারেন তাহলে খাওয়ার পর কিছু সময় অপেক্ষা করে (অবশ্য আজানের আগে দিয়েই) দাঁত মেজে নিতে পারবেন। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ইমানের অঙ্গ আর রমজান মাসের পবিত্রতা রক্ষা করার কথাও বারবার বলা হয়, সুতরাং রমজান মাসেও টুথপেস্ট ও টুথব্রাশ দিয়ে ভালভাবে দাঁত মাজার বিকল্প নেই।

দাঁতের যত্নে আর পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার জন্য বর্তমানে অনেক প্রকারের প্রসাধনী আর প্রযুক্তি সহজলভ্য।

দন্ত চিকিৎসা এখন মোটামুটি এগিয়ে গেছে। নিজ গৃহে নিজে নিজে নিয়মিত দাঁতের যত্ন নেওয়ার জন্য আর ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন প্রসাধনী এখন পাওয়া যায়। যার মধ্যে সহজলভ্য থেকে শুরু করে ব্যয়বহুল আর জটিল প্রকারের বিভিন্ন প্রসাধনী রয়েছে।

এছাড়া দাঁত পরিষ্কার করার জন্য যে সকল সামগ্রী সচারচর ব্যবহৃত হয় যেমন টুথব্রাশ-টুথপেস্ট, টুথপাউডার, নিমের মাজন, কালো মাজন, মেসওয়াক আর নিমের ডাল ইত্যাদি ইত্যাদি প্রসাধনী'র মধ্যে টুথব্রাশ আর টুথপেস্টই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ। অন্যান্য সামগ্রী সমুহের চাইতে এই দুটি সামগ্রী বিশেষ উপযোগী যেখানে অন্যগুলোর উপযোগিতার পাশাপাশি কিছু ঋণাত্মক দিকও আছে যা টুথব্রাশ ও টুথপেস্টের ক্ষেত্রে নেই বললেই চলে।

পেস্ট-ব্রাশই শ্রেষ্ঠ সেটা বুঝতে গেলে পেস্ট ও ব্রাশ আর দুইটার কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে কিছু কথা জানার প্রয়োজন। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে বর্তমানকালের ব্যস্ততার যুগে সাধারণত ডেন্টিস্টগন প্রায়ই রোগীর আধিক্যেতার কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলা সব রোগীর কাছে বর্ণনা করতে সময় পান না।

ডেন্টিস্ট্রি বা দন্তচিকিৎসা বিজ্ঞানে Dentifrice (ডেন্টিফ্রিস) বলে একটি শব্দ আছে, এটির দ্বারা এক কথায় টুথপেস্ট, জেল, টুথপাউডার ও মাউথ ওয়াশ-এর মত মুখ পরিষ্কার রাখার সামগ্রী গুলোকে বুঝানো হয়। টুথপেস্টের প্রধানত চারটি উপাদান থাকে
 ১. abrasives বা খশখশে উপাদান যা অনেকটা শিরিশ কাগজের মত কাজ করে ও দাঁতের ময়লা উঠাতে সাহায্য করে।
 ২. surfactants, এই উপাদানের কারণে টুথপেস্টের আচরন সাবান বা ডিটারজেন্টের মত হয়, অর্থাৎ পানি মিশিয়ে মাজলে ফেনীয়ে উঠে।
 ৩. humectant, এই উপাদানটি ময়েশ্চারাইজারের কাজ করে।
 ৪. binder, এটি টুথপেস্টের উপাদান গুলোকে ধারন করে আর জড়িয়ে রাখে।
 ৫. flavors, শিশুদের মুখে যাতে পেস্টের টেস্ট বেশী ঝাঁঝালো আর অসহ্য না লাগে সেজন্য কিছু মিষ্টি, ফলের, চকোলেটের বা অন্যান্য মুখরোচক ফ্লেভার যোগ করা হয়।
এছাড়াও কিছু কিছু বিশেষ বিশেষ টুথপেস্ট আছে যেগুলাতে দীর্ঘ সময় মুখ সতেজ রাখা, দাঁতের ক্ষয়রোধ, ক্ষয় হয়ে যাওয়া দাঁতের পুনরায় সুস্থতা লাভ, দাঁতের শিরশিরানি নিরাময়, দাঁতে অতিরিক্ত ময়লা জমা হওয়া প্রতিরোধ করা ও দাঁত উজ্জ্বল করা ইত্যাদি উদ্দেশ্যে বিশেষ বিশেষ ঔষধি উপাদান মিশানো হয়।

প্রথমত, টুথপেস্টের/জেলের মত নরম ক্রিম বা জেলের মত মাধ্যম না থাকায় ও শুকনো গুঁড়ার রূপে থাকায় পাউডার জাতীয় দাঁতের মাজন যেমন টুথপাউডার বা নিমের মাজনের "abrasive" বৈশিষ্ট্য টি একটু বেশী কার্যকর থাকে, যার ফলে দীর্ঘদিন ধরে অসাবধানতা বশত পাউডার দিয়ে বেশি ঘষে দাঁত মাজলে দাঁত ক্ষয় হতে শুরু করবে। তাই এ ক্ষেত্রে পেস্টই বেশী উপযুক্ত, আর পাউডার জাতীয় মাজন ব্যবহারে এক্ষেত্রে সচেতন থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, মেসওয়াক বা নিমের ডালের মত মাজন উপকরণগুলোর ভেষজগুণ থাকলেও সেগুলো ব্রাশের মত কার্যকর ভাবে মুখ পরিষ্কার করতে পারবে না। ব্রাশের মত সুক্ষ্ম ও নমনীয় না হওয়ায় নিমের ডাল বা মেসওয়াক দিয়ে দাঁতের ফাঁক ফোকরে পরিষ্কার করা যায় না। বরং পাউডারের মতই মেসওয়াক ও নিম ডালের উপর্যুপরি ব্যবহার ও প্রয়োজনের অধিক জ্বোর লাগিয়ে দাঁত মাজলে হিতে বিপরীতই হবে। দীর্ঘদিন এমন করলে দাঁতের গোড়া ও মাড়ি উলটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। অপর পক্ষে ব্রাশের সাহায্যে টুথপেস্ট ও ফেনা অতি সহজেই দাঁতের ফাঁকে ঢুকে পরিস্কার করতে পারে।

আবার মাউথওয়াশ, ফ্লসিং আর টুথপিক হলো পেস্ট ও ব্রাশের পরিপূরক মাত্র। মাউথওয়াশ ব্রাশের মত সলিড ময়লা সরাতে পারবে না, আর ফ্লসিং বা টুথপিক এর মাধ্যমে টুথপেস্টের রোগ প্রতিরোধী ও দীর্ঘ সময় ধরে ময়লা প্রতিহত করার গুণ গুলোর সুবিধা পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ ফ্লস, টুথপিক আর মাউথওয়াশ ব্যবহার করতে হবে ব্রাশ ও পেস্টের পাশাপাশি (বিকল্প হিসেবে নয়)। অার মেসওয়াক বা টুথপাউডার ব্যবহার করলেও পেস্ট ও ব্রাশের স্থায়ী বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা মটেও উচিৎ নয়। যাদের মেসওয়াক আর নিম পছন্দ তারা চাইলে মেসওয়াক আর নিমের নির্যাশ যুক্ত ভেষজ টুথপেস্টও ব্যবহার করতে পারেন।

অবশ্য এর মানে এই নয় যে মেসওয়াক, নিমের ডাল, টুথপাউডার, নিমের মাজন বা কালো মাজন একেবারেই বর্জন করতে হবে। এর প্রত্যেটার বিশেষ বিশেষ গুন আছে যার কারণে মাঝেমাঝে হালকা পরিমাণ ব্যবহার করলে উপকারিতা অবশ্যই পাওয়া যাবে। শুধু অতিরিক্ত কোনও কিছুই ব্যবহার করা উচিৎ নয়। আর টুথপেস্ট ও টুথব্রাশের বিকল্প হিসেবে নয় বরং পরিপুরক হিসেবে এগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে।

-

ডা. শেখ আনোয়ার উল্লাহ খন্দকার, বি.ডি.এস. পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজ।